নীলঘর

আনিতা আমার দুই বছরের বড়। তাকে কি আপু ডাকবো?
সে স্কুল, কলেজ পেরিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি সদ্য কলেজ ধরেছি। নাকের নিচে কালো রেখা অস্পষ্ট উঁকি দিচ্ছে। জানান দিচ্ছে পৌরুষ। চনমনে ভরপুর আবেগতাড়িত মন।
ধরাকে লাঠিম ভাবি। সরাকে ভাবি বালিকণা।
আর আনিতা!
মাত্র তো দুই বছরের বড়। তাকে কেনো ডাকবো আপু?
আনিতা। হ্যাঁ, শুধুই আনিতা। হোক সে অনেক সুন্দরী। হোক সে এ পাড়ায় নিউকামার।
দুই.
সকাল দশটা।
গেটের সামনে রিকশার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি। কলেজে যাবো। মোড়ে রিকশারা থাকে। অতোখানি হাঁটতে ভালো লাগছে না। এদিকে হঠাৎ হঠাৎ রিকশা আসে- সেই আশায়।

‘অ্যাই ছেলে, অ্যাই!’
আমি পেছন ফিরে তাকাই। আনিতা।
কে? আনিতা!! সম্বিত ফিরে পাই।
আমকে বলছে ছেলে? এই সত্তর ইঞ্চি লম্বা, সাড়ে সাতান্ন কেজি ওজন আর চওড়া বুকের অধিকারী তরুণ প্রয়াত সদ্য যুবককে বলছে ‘ছেলে’?
মাইয়্যার সাহস কতো! ভাবি আমি। আনিতার মাত্র দুই বছরের ছোট আমি, তাও সাইজে নয়- বয়সে।
‘আরে এদিকে এসো না!’ আবার ডাকে আনিতা।
আমি এগিয়ে যাই, আনিতাদের বাড়ির গেটের কাছে- আনিতার কাছে।
‘মোড়ে যেতে ভালো লাগছে না আমার। আমাকে একটা রিকশা ডেকে দাও তো।’
দেখছো মাইয়্যার কারবার! রাগে ফুঁসি আমি।
আনিতা রিকশায় চড়ে। এবং চলে যায়।
আমকে ধন্যবাদও দেয় না।
ডিজগাস্! কিপ্টুস!!

তিন.
‘ও-ই তো রুদ্র, না আন্টি?’
বিকেলে বাসায় ফিরে দেখি মায়ের সঙ্গে জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছে আনিতা।
‘হ্যাঁ, আমার একমাত্র ছেলে।’ মা জবাব দেন। ‘রুদ্র, তোর আনিতা আপু। পাশের বাড়িতে নতুন এসেছে।’
আ-নি-তা-আ-পু! হুহ্!! ভাবি আমি।
‘ওকে আমি চিনি আন্টি। খুব ভদ্র ছেলে।’ বলে আনিতা।
আনিতার সার্টিফিকেট আমি চাই না।
মাত্র দুই বছরের বড়!
আমি আমার রুমের দিকে পা বাড়াই।
‘অ্যাই ছেলে, এদিকে এসো।’ ডাকে আনিতা। ‘শুনলাম তুমি নাকি খুব জিনিয়াস! বলতো এক আর এক মিলে কতো হয়?’
ভালো লাগে আমর আনিতার ছেলেমানুষী।
ভাবছি দাঁত-ভাঙ্গা জবাব দেবো কি-না?
‘দুই।’ সংক্ষেপে বলি আমি।

আনিতা হাসে। জয়ের হাসি।

তার হাসিটা কি বন্ধ করে দেবো?
‘তবে আপনি ইচ্ছে করলে এক-ও বলতে পারেন।’ শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর সংযত করতে না পেরে বলেই ফেললাম।
আনিতা তার হাসি কোৎ করে গিলে ফেললো।
‘আর আমি?’ আনি নিজের দিকে তর্জনী নির্দেশ করি। ‘সব সময় এগারো বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’
আনিতা ভ্যাবাচ্যাকা খায়।
মা হা করে চেয়ে থাকে।
আমি মজা পাই।
হ্যাঁ, এবার আমি আমার রুমে যেতে পারি।

চার.
সূর্যের কুসুম লাল রঙ, যেটা বিকেল বেলা দেখা যায় পশ্চিম আকশে- আমর খুব ভালো লাগে।
আমার খেলাধুলা-বিনোদন সবকিছু কম্পিউটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তাই বিকেলে রঙ দেখতে আমি ছাদে উঠি প্রতিনিয়ত। আজও যেমন উঠেছি।
তখন সূর্যের রঙ দ্রুত পাল্টে যায়।
ছাদের পশ্চিম পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই শুনতে পেলাম-
‘অ্যাই রুদ্র, কি করছো?’
বাম দিকে তাকিয়ে দেখি আনিতা- পাশের ছাদে।
‘সূর্য দেখছি, আকাশ দেখছি।’ বলি আমি।
‘কি হবে দেখে?’ আনিতা ছেলেমানুষী করে, আমার ভালো লাগে।
‘হওয়ানোটা খুব কঠিন ব্যাপার!’ জবাব দেই আমি। ‘তবে চেষ্টা করতে দোষ কোথায়?’

আনিতা হাসে। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে।
আনিতা রূপবতী। আনিতা সুন্দরী।
‘একা একা কেউ হওয়াতে পারে?’ লজ্জামাখা কণ্ঠ আনিতার।
পারা না-পারার তর্কে আমি যাই না।
অবাক বিস্ময়ে আনিতার দিকে চেয়ে থাকি।
বিকেলের নরোম রোদ আনিতার গালে পড়েছে। চুয়ে চুয়ে কোমল রোদ স্পর্শ করে আছে আনিতাকে। মায়াবী এক চিত্র।
সম্মোহন করলো আমাকে।
বিকেলের নরোম রোদের নতুন খেলা আবিষ্কার করি, আনিতার গালে- আনিতার মাঝে।

আনিতা হাসে। হাসে বিকেলের রোদ।

আমি বলি- ‘আনিতা তুমি কী জানো?’
আনিতার দ্বিধাহীন জবাব, ‘তুই যতোটুকু জানিস্ আমি তার চেয়ে একটু কম জানি।’
‘এ কথা কেনো বলছিসরে আনিতা?’ রাজ্যের বিস্ময় আমার মাঝে।

আনিতা হাসে। হাসে বিকেলের নরোম রোদ।

অবাক হয় আনিতা। কিংবা হবার চেষ্টা করে।
সে সফল হয় না। কিংবা হতে চায় না। তার অবাক ভয়ে পরিণত হয়।
‘আমি জানি না রুদ্র। আমি জানি না। তুমি কি আমকে জানাতে চাও?’
আনিতার সম্বোধন করার ছেলেমানুষী আমার ভালো লাগে না।
বলি, ‘তোকে কেনো আমি জানাতে যাবো?’

আনিতা হাসে। হাসে বিকেলের রোদ।
আনিতা হাসে। হাসে বিকেলের…
আনিতা হাসে। হাসে…

বিশ বছর পরের কথা।
শহরতলীর একটি চমৎকার নীল বাড়ির গল্প শুনুন।
বাড়িটির নাম নীলঘর।
নীলঘরের সবকিছুই নীল। বাইরে থেকে তা-ই অনুভব হয়।
বাগানের ফুল, চেয়ার টেবিল নীল। দরোজা, জানালা, দেয়াল নীল।
বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা পাঁচজন।
তিনজন মনিব। দুজন চাকর।
একজন স্বামী, একজন তার স্ত্রী। এবং অন্যজন তাদের সন্তান।
সময় বিকেল। আকাশে সূর্যের কুসুম লাল রঙ।
বাড়ির ছাদের পশ্চিম পাশে রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে আনিতা।
আনিতা বললো, ‘তুমি কি সূর্য দেখতে দেখতে চা খাবে? নাকি পরে খাবে?’
‘আনিতা, আমি এখন কিছুই খাবো না।’ আনিতার চোখে চোখ রাখে রুদ্র- যা সে বিশ বছরেও পারেনি। তারপর বললো- ‘তুমি আমার পাশে থাকো। তুমি আমার পাশে থাকলে আমর অনেক সুখ লাগে।’
‘তাহলে তুমি এতোদিন সুখে ছিলে না?’ আনিতার অবাক বিস্ময়ের জিজ্ঞাসা।

Advertisements

4 Responses

  1. গল্পটা আমার অনেক ভাল লেগেছে।

  2. ধন্যবাদ bangla forum, আমার ব্লগে এসে মন্তব্য করার জন্য। আশা করছি ভবিষ্যতেও আপনাকে পাবো।
    এই ব্লগের জন্য পরামর্শ, মতামত জানিয়ে আমাকে হেল্প করলে খুবই খুশি হবো।
    ধন্যবাদ আবারও।

  3. বাড়িটির নাম নীলঘর।

  4. তুমি আমার পাশে থাকলে আমর অনেক সুখ লাগে।’
    ‘তাহলে তুমি এতোদিন সুখে ছিলে না?’ আনিতার অবাক বিস্ময়ের জিজ্ঞাসা।
    জোস হইছে গল্পটা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: